সোমবার, ১৫ নভেম্বর, ২০২১

রেহানা মরিয়ম নূর দেখার পর...

 


ঘোলা ক্যান ভাই? ম্যুভি শুরু হইছে মিনিট পাঁচেক হইলো, এই সময়টা খুব মনযোগ ধইরা রাখার চেস্টা করি আমি। বেচারা লেট লতিফ দর্শক দুইটা ভুল করলেন পরপর। সাথে আরেকটা ভুলেরও উপলক্ষ্য তিনি। তার কারণে হলের স্টাফ টর্চ জ্বালাইতে বাধ্য হইছে, একেতে অসছে দেরি কইরা তার উপর সুবেদারের মতোন গলায় কয়, ঘোলা ক্যান ভাই। হলের স্টাফ ইশারায় চেয়ার দেখিয়ে দিতে দিতে বললেন, ‘এইডা এইরকমই’। ওই পাশ থেকে আরেক ভদ্র অথবা অভদ্রলোক মোবাইলে ব্রাউজ করতাছে। মাথার পিছনে একজোড়া কইতর দর্শক ফুসুর-ফুসুর করে। এই সব কিছুকে আস্তাকুড়ে ছুঁড়ে আবারও মগজ বন্ধক রাখলাম পর্দায়। আপনার কাছেও হয়তো ম্যুভিটি ঘোলা লাগতে পারে, নীল রং-এর বাড়াবাড়ি চোখে লাগতে পারে, ভিজ্যুয়াল চোখে পড়ার মতো নড়াচড়া বিরক্ত করতে পারে, এক পলকের জন্য হয়তো ভ্রম হতে পারে, কোন এ্যামেচার টিমের কাজ নয়তো? না। তা নয়, বরং উল্টো এইগুলোই এই ছবির প্রাণভোমরা বললে বাড়িয়ে বলা হবে না হয়তো।

পাঠক, বুঝতেই পারছেন; বলছি আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদের ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রের কথা। শিরোনাম রিভিউ লেখা আছে দেখা বিভ্রান্ত হবেন না। এইটা রিভিউটা না। চলচ্চিত্রের রিভিউ দেয়া এত্তো সোজা না। আমার মতো মূর্খের জন্যতো না-ই। তারউপর মাত্র একবারের জন্য একটা ম্যুভি দেখে কথা বলাটাই দুঃসাহসিক কাজ। তাই আমার এ লেখাটি বড়জোর টিভিউ হতে পারে। ওই যে আমরা বলি না, চা-টা বিস্কিট-টিস্কিট; ওই রকমই জিনিস এই টিভিউ।

এই ম্যুভির সবচে শক্তিশালী জায়গা হলো চিত্রনাট্য এবং অভিনয়। চিত্রনাট্য সাজাইতে রেহানা মরিয়ম নূর টিমকে কতো রাত বসে বসে কাটাইতে হইছে কে জানে। অভিনয়ে মূল চরিত্র বাঁধনকে নিয়াতো আর নতুন করে বলবার কিছু নাই, তারপরও যেহেতু লিখতাছি একেবারে কিছু না কইলেও খ্রাপ দেহায়। এক কথায়, বাঁধন এই ম্যুভিতে বাঁধন ছিলেন না, তিঁনি রেহানা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। চরিত্রে যতোটা গভীরে ডুব দিয়ে শালুক তুলে আনা যায় তিঁনি ডুবেছিলেন ততোটাই। পার্শ্ব চরিত্রে অ্যানি এবং ইমো তুরুক। এই দুইটি চরিত্রে যারা অভিনয় করেছেন ওঁদের নাম আমি জানি না, ইচ্ছা করলে নেট ঘাইটা জাইনা নিতে পারি কিন্তু ইচ্ছা করতাছে না। অ্যানিকে অতি সম্ভাবনাময় মনে হইছে। আমার মনে হয় ওঁর ভবিষ্যৎ ফকফকা। আর ছোট্ট ইমুর কথা কী বলবো, শতভাগ ভালোবাসা রইলো। একদম শেষে ইমুতো আমার দমবন্ধ করে মারার প্লাণ করতাছিলো। আরেফিন চরিত্রটিও মুগ্ধ হয়ে দেখেছি। ফাটাফাটি। প্রিন্সিপাল, মিমি, রেহনার ভাইসহ প্রত্যেকটা ছোট-বড় চরিত্র যার যার জায়গা থেকে শতভাগ উজাড় করে দিয়েছেন। ম্যুভিটা দেখেই বোঝা যায় রেহানা মরিয়ম নূরের টিম বন্ডিংটা ফেবিকলের চেয়েও মজবুত।


আহমেদ ছফার ‘পুষ্প বৃক্ষ এবং বিহঙ্গ পুরাণ’ উপন্যাস পড়ার পর আমি নার্সারি থেকে অনেক গান কিনে আনছিলাম। ওই রকম বৃক্ষপ্রেম আমার নাই যে, বহুতল বস্তির কর্ণার ফ্লাটের জন্য গাদা গাদা গাছ নিয়ে আসবো। আসলে ছফা আমাকে বাধ্য করেছিলেন। এইখানেই লেখক শিল্পী নির্মাতার যাদু। সাধে কী লোকে ওঁদের নামের আগে যাদুকর বলে থাকে। সাদের এই ম্যুভির যাদুর রেশও অনেক দিন থাকতে পারে আপনার মগজের ঘুলঘুলিতে। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক শুনে প্রথমেই আমার মগজে আসে পিঙ্ক ফ্লয়েডের গানের সংগীতায়োজন। টুকরো টুকরো বিমূর্ত শব্দ আচ্ছন্ন করে রেখেছি পুরো একঘন্টা চুয়াল্লিশ মিনিট প্রায়। পুরো ম্যুভিতেই ভাববার মতো বিস্তর রসদ আলতো করে পরম যত্নের সাথে পরিচালক তুলে দিয়েছেন আমার হাতে, আমাদের হাতে। কোন নিদৃষ্ট উপসংহার নাই, গল্প বলার ঢং গদ্যের মতো, দিনশেষে একটা দীর্ঘ কবিতা। পাঠকের মতোন ভেবে নিতে হবে দর্শককেই।

‘কেউ দেখেনি মানে কী ঘটনাটি ঘটেনি?’ এইরকম বেশ কিছু সংলাপ পকেটে নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। নারীবাদ, ধর্ম ইত্যাদি ছিলো নুনের মতো, প্রতিবাদ ছিলো, লড়াই ছিলো, ছিলো রুঢ় বাস্তবতা। দিনশেষে একজন বাঙালী, বাংলাদেশী দর্শক হিসেবে আমি গর্বিত। সিনেমার মশালটা জ্বালিয়ে রাখার জন্য ধন্যবাদ ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ টিমকে। মাথার নাগাল না পেলেও বিশ্ব চলচ্চিত্রের কান ধরে টান দেয়া ছোটখাট বিষয় না, নিশ্চয় পরেরবার মাথার দেখাটাও পেয়ে যাবেন সাদ...



 

লেবেলসমূহ:

1টি মন্তব্য:

১৬ নভেম্বর, ২০২১ এ ৬:৩৬ PM -তে, Blogger সেজুল বলেছেন...

ভালো পর্যবেক্ষণ

 

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

এতে সদস্যতা মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন [Atom]

<< হোম